দৃষ্টি (একটি বেসরকারী সমাজকল্যাণমূলক সেচ্ছাসেবী সংস্থা) পিসিআরসিআর প্রকল্প
প্রকল্প সহযোগীতা হিসাবে কোভিড’১৯ মোকাবিলার উপর প্রতিবেদন:
দৃষ্টি, অসহায় ও প্রান্তিক মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কুমিল্লায় কাজ করে যাচ্ছে। কুমিল্লা জেলার সিটি কর্পোরেশন এলাকাসহ সদর উপজেলা সংস্থার কর্ম এলাকা। বর্তমানে দৃষ্টি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর মাধ্যমে ইউকেএইড-এর আর্থিক সহায়তায় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ১২টি ওয়ার্ডে শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষায় ”প্রটেকশন অফ চাইল্ড রাইট্স থ্রো কমিনিউটি রেসপন্স (পিসিআরসিআর)” নামক একটি প্রকল্প ফেব্রোয়ারী-২০১৯ থেকে পরিচালনা করে আসছে। উক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৫০০ ঝড়ে-পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুদেরকে অধিকার সচেতন করে স্বেচ্ছায় লেখাপড়া ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কম-ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুনর্বহাল ও আত্মনির্ভর করাই প্রকল্পের লক্ষ্য।
এক্ষেত্রে দৃষ্টি তার কর্ম-এলাকায় ৪৭৯ কলকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫৪৬২ জন শ্রমে নিয়োজিত শিশুকে খুঁজে পায়। চিহ্নিত শিশু, তাদের পিতামাতা/অভিভাবক, কলকারখানার মালিক (শিশুদের চাকুরীদাতা), স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষ, জন প্রতিনিধি ও গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ এবং স্থানীয় সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের সাথে সমন্বয় ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। উঠান বৈঠক, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক সভা, প্রশিক্ষণ ও এডভোকেসী মিটিং ইত্যাদি কার্যক্রম দ্বারা অভিভবাবক, চাকুরীদাতা, জন প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে প্রকল্প সহায়ক পরিবেশ তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আমরা ১২টি ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে ০৬টি শিশু-বান্ধব কেন্দ্র স্থাপন ও শিশুদের দল গঠন করে দলীয় ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে তাদের মনন ও মেধা বিকাশে এবং তাদেরকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে কাজ করছি। লেখাপড়ায় ফিরতে অপারগ শিশুদের বিকল্প ঝুঁকিমুক্ত ও আয়বর্ধক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।
মার্চ ২০২০ অবধি, চিহ্নিত ৫৪৬২ জন শ্রমে নিয়োজিত শিশু (ছেলে-২৫৫৭ জন এবং মেয়ে ২৯০৫ জন) মধ্যে আমরা ২৪৩৩ (ছেলে-১০৮১ এবং মেয়ে-১৩৫২) জন শিশুকে লেখা-পড়ায় ফিড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি। এরমধ্যে ১৭৫৮ জন (ছেলে-৭৭০ এবং মেয়ে-৯৮৮) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ১৭৫ জন (ছেলে-৫২ এবং মেয়ে-১২৩) উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং ৫০০ জন (ছেলে-২৫৯ এবং মেয়ে-২৪১) আমাদের শিশু-বান্ধব কেন্দ্রে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় নিয়োজিত আছে। তাছাড়া ৭১১ জন শিশুকে (ছেলে-৩২৩ এবং মেয়ে-৩৮৮) ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে কম-ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পরিবর্তন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২৩১৮ (ছেলে-১১৫৩ এবং মেয়ে-১১৬৫) শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সাথেও আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছি। আশা করছি প্রকল্প মেয়াদকালে অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর ২০২১ সাল নাগাদ চিহ্নিত সকল শ্রমজীবী শিশুকে আমরা কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনর্বাসনে সক্ষম হব।
পুনর্বাসিত শিশুদের সুরক্ষায় ইতিমধ্যে তাদের পরিবারের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হিসাবে ইচ্ছুক পরিবারের ১০০ জন সদস্যের জন্য আমরা সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি, যাতে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ না হয়। সর্বক্ষেত্রে আমরা ফলোআপের ব্যবস্থাও রেখেছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও ১৫০ পরিবার সদস্যকে আয়বর্ধক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। যে সকল শিশু তাদের পরিবারের ভরণ-পোষনে কাজ ছাড়তে পারবে না তাদের জন্য উপযোগী দক্ষ কারিগরী প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হবে যাতে ঐসকল শিশুরা সচেতনতার ও দক্ষতার সাথে উপযুক্ত কাজ করে এবং সুন্দর জীবন-যাপন করতে পারে। এছাড়াও স্কুলে ভর্তি করা শিশুদের মধ্যে অসহায় ও দরিদ্রের মাঝে ভর্তি ফি, স্কুল ড্রেস, জুতা ও নিয়মিত শিক্ষা ্উপকরণ বিতরণ করা হয়। শিশু-বান্ধব কেন্দ্রে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষারত শিশুদেরকে মাসে ্একবার পুষ্টিকর বিস্কুট বিতরণ করা হয়। শিশুদেরকে নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক এবং ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস সমূহ পালন করা হয়।
এই ধারাবাহিকতায় এবছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন ১৭ই মার্চ ২০২০ ”মুজিব শতবর্ষ ও জাতীয় শিশু দিবস পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ এর প্রভাব বিস্তার
রোধে সরকার কর্তৃক সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে সকল স্কুল, অফিস ও কর্মস্থলে সাধারণ ছুটি
ঘোষনা করায় বিগত ২৪ মার্চ ২০২০ থেকে আমাদের অফিস ও শিশু-বান্ধব কেন্দ্রসমূহে সকল কার্যক্রম স্থগিত ও বন্ধ রাখা হয়।
করোনা ভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে প্রাথমিক পর্যায়ে মার্চ-১৮, ২০২০ দৃষ্টি নিজস্ব তহবিল থেকে ১০,০০০ (দশ হাজার) লিফলেট প্রিন্ট করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ন এলাকায় জনগনের মাঝে বিতরণ করা হয়।
লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি মার্চ ২১-২৪, ২০২০ সময় কালে প্রাথমিক পর্যায়ে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় দৃষ্টি-পিসিআরসিআর প্রকল্পের আওতাধীন অতিদরিদ্র ২০০ (দুই শত) শিশু ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য ১টি করে সাবান ও ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার (জীবানু নাশক হিসাবে বাড়ীর আঙ্গিনায় ছিটানোর জন্য) সরবরাহ করা হয় এবং শিশুদেরকে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
পিসিআরসিআর প্রকল্পের আওতাধীন শ্রমজীবী শিশুদের অধিকাংশ পরিবার প্রধান ও পরিবার সদস্যগন দিন-মজুর, রিক্সা-ভ্যান চালক, নিত্য আয়ের মাধ্যমে সংসার পরিচালনা করে থাকে। করোনা ভাইরাস প্রসার রোধে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বর্তমান ছুটি ও দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার নিমিত্তে প্রকল্পের আওতাধীন অতিদরিদ্র শ্রমজীবী শিশু পরিবারের খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায় এপ্রিল-০১ ও ০৪, ২০২০ সময়ে প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার ১০০ পরিবারের মধ্যে ০৫ (পাঁচ) কেজি চাল, ০১ (এক) কেজি ডাল, ০১ (এক) লিটার তেল, ০১ (এক) কেজি লবন ও ০১ (এক) টি (৫৭০) সাবান সমেত পরিবার প্রতি একটি খাদ্য-সামগ্রীর প্যাকেট প্রকল্পের দাতা সংস্থার অনুমোদন ক্রমে মধ্যবর্তী আপদকালীন সহায়তা হিসাবে নির্ধরিত ১০০ (একশত) টি শিশু পরিবারকে দৃষ্টি- পিসিআরসিআর প্রকল্পের কর্মীগন পৌছে দেন। একান্ত প্রয়োজনে দৃষ্টি আরও ০৫ (পাঁচ) টি খাদ্য-সামগ্রীর প্যাকেট আরও পাঁচটি পরিবারকে প্রদান করে। ফলে, মোট ১০৫টি পরিবার এই সহায়তার আসে। অত্র সঙ্গে বিতরনের মাষ্টার রোল সংযোক্ত করা হল।
এখানে উল্লেখ্য যে, এহেন খাদ্য সহায়তা করোনা ভাইরাসের প্রভাব প্রসার প্রতিরোধে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল। পরিস্থিতির বিবেচনায়, এ উদ্যোগে আরও অধিক পরিবারকে অর্ন্তভূক্ত করা দরকার তাছাড়া শিশুদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য মাস্ক সরবরাহ দরকার।
প্রতিবেদন প্রনয়নে ঃ মোঃ আলী আজ্জম, প্রকল্প সমন্বয়কারী, পিসিআরসিআর প্রকল্প, দৃষ্টি
প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদনে ঃ পাপড়ী বসু, নির্বাহী পরিচালক, দৃষ্টি।
অনুলিপিঃ ১. মাননীয় জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা।
২. মেয়র, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন।
৩. মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ঢাকা।
সংযুক্তিঃ ১. খাদ্য-সামগ্রী বিতরণের মাষ্টাররোল
২. বিতরণকৃত লিফলেটের কপি


No comments